সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রাত্রিকালীন কতিপয় সুন্নত মুবারক

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

والذين امنوا وعملوا الصالـحات لندخلنهم فى الصالـحين

অর্থ: নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনে আমলে ছালিহ  (নেক আমল) করবে, আমি অবশ্যই অবশ্যই তাদেরকে ছালিহীন তথা ওলীআল্লাহগণ উনাদের অন্তর্ভুক্ত করবো। (পবিত্র সূরা আনকাবূত শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭)

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ইতায়াত বা অনুসরণ-অনুকরণে যে আমল করা হয় সেটাই হচ্ছে আমলে ছালিহ বা নেক আমল। উনার ইতায়াত বহির্ভূত যত নেক আমলই করা হউক না কেন তা আমলে ছালিহ উনার অন্তর্ভুক্ত নয়। সেটা দ্বারা কখনোই মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার রসূল, নূর মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাক্বীক্বী (প্রকৃত) মুহব্বত, তায়াল্লুক, নিছবত, নৈকট্য লাভ হয় না।

কাজেই, মু’মিন-মু’মিনাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুসরণ-অনুকরণ করা আবশ্যক।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে রয়েছে, “ঘুম হচ্ছে মৃত্যুর সহোদর।” প্রত্যেক  প্রাণীই প্রতিদিনই সেই সহোদর ভাইয়ের সাথে মুলাক্বাত করে। আর তা একান্ত প্রয়োজনও বটে। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ অতিবাহিত হয়েছেন। যারা সেই সহোদরের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমে পরপারে চলে গেছেন। আজ যারা জীবিত আছেন তাদেরও যে এমন হতে পারে না তা বলা যায় না। বরং সবার জীবনে এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলেই তার জন্য সকলের প্রস্তুত হওয়া উচিত।

আর পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত আছে-

انما الاعمال بالخواتيم

অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “শেষ আমলের উপরই ফায়সালা।” (আহমদ শরীফ, যারকানী, ফাতহুল বারী)

তাই জীবনের শেষ আমলটি যদি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরিপূর্ণ ইত্তিবা বা অনুসরণ-অনুকরণে সম্পাদিত হয় তাহলে সেটা যে, উনার সাথে অবস্থান এবং কামিয়াবীর আলামত। তা জ্ঞানী মাত্র উপলব্ধি করতে পারেন।

কেননা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছেন যে-

من احب سنتى فقد احبنى ومن احبنى كان معى فى الجنة

অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আমার সুন্নত উনাকে মুহব্বত করলো সে যেন আমাকেই মুহব্বত করলো। আর যে আমাকে মুহব্বত করলো সে আমার সাথেই জান্নাতে অবস্থান করবে।” (তিরমিযী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সাধারণত রাতের প্রথমাংশে বিশ্রাম মুবারক গ্রহণ করতেন। আর শেষাংশে তাহাজ্জুদ নামায, যিকির-ফিকির, তাসবীহ-তাহলীল, দোয়া-মুনাযাত মুবারকে মনোনিবেশ করতেন। আবার কখনোবা মধ্য রাতে ইবাদত-বন্দেগী করতঃ শেষাংশে কিছুক্ষণ বিশ্রাম মুবারক গ্রহন করতেন।

আবার কখনো, কিংবা বিশেষ বিশেষ দিনে সারা রাতই ইবাদত-বন্দেগী, যিকির-ফিকির মুবারক করতেন। আর এগুলো সবই যে উম্মতকে তা’লীম দেয়ার জন্যই করেছেন তা ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কখনো যদি রাতে তাহাজ্জুদ নামায বা রাত্রিকালীন আমল না করতেন তাহলে দিনের বেলা ৪/৬/১২ রাকায়াত নামায আদায় করে নিতেন। সাথে অন্যান্য আমলগুলো করারও শিক্ষা দিয়েছেন।

উল্লেখ্য যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সকলের জন্যই উত্তম আদর্শ। তা মহান আল্লাহ পাক তিনিই ইরশাদ মুবারক করেছেন-

لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة

অর্থ: “অবশ্যই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র জীবনী মুবারকে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ : পবিত্র অয়াত শরীফ ২১)

প্রতিটি ক্ষেত্রেই উম্মতের জন্য তা’লীম বা শিক্ষা রয়েছে। কেননা উনি রাতে নামায আদায় করতে পারবেন না তা কি করে বিশ্বাস করা যায়? এরূপ চিন্তা করাও কাট্টা কুফরী। তিনি স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন-

يا عائشة عليها السلام ان عينى تنامان ولا ينام قلبى

অর্থ: “হে উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম! আমার চোখ মুবারক ঘুমায় কিন্তু আমার অন্তর মুবারক ঘুমায়না। (তিরমিযী শরীফ)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে শয্যা মুবারক গ্রহণ করার পূর্বে মিসওয়াক মুবারক করতঃ অযু মুবারক করতেন। চোখ মুবারকে সুরমা মুবারক দিতেন। প্রথমে ডান চোখ মুবারকে ২ বার, অতঃপর বাম চোখ মুবারকে ২ বার। তারপর ডান চোখ মুবারকে ১ বার। এরপর বাম চোখ মুবারকে ১ বার। আবার কোনদিন ডান চোখ মুবারকে ৩ বার। আর বাম চোখ মুবারকে ২ বার। এছাড়াও কোনদিন ডান চোখ মুবারকে ৩ বার। আর বাম চোখ মুবারকে ৩ বার দিতেন। উনি যে সুরমা মুবারক ব্যবহার করতেন তা ছিল ইসমিদ। সে সুরমা মুবারক ছিল সাদা, খয়েরী এবং কালো রঙের। তবে তিনি কালো রঙের সুরমা মুবারক বেশি পছন্দ করেছেন।

الاثمد (ইসমিদ) হচ্ছে মিশক মিশ্রিত এক প্রকার সুরমা। যা ইসমিদ পাথরের চূর্ণ বা গুড়া। ইহা ইসপাহান, শাম ও হিজাজে পাওয়া যায়। তাছাড়া এই ইসমিদ (সুরমা) উনার জন্য বর্তমানে সউদী আরবে বিখ্যাত হলেও এর ফাযায়িল-ফযীলত, গুরুত্ব তাৎপর্যের সাথে মুসলিম উম্মাহকে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তুলেছেন যামানার ইমাম ও মুজতাহিদ, মুজাদ্দিদে আ’যম, গাউছুল আ’যম, হাবীবে আ’যম, রাজারবাগ শরীফ উনার মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম। তিনি সেই ইসমিদ (সুরমা) ব্যবহারের বিলুপ্ত সুন্নত মুবারককে জিন্দা বা পূনঃপ্রচলন করেছেন। তিনি উম্মাহর কাছে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হাদীছ শরীফসমূহ উম্মাহর কাছে তুলে ধরেছেন স্পষ্টভাবে। যেখানে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

ان من خير اكحالكم لاثمد انه يجلو البصر وينبت الشعر.

অর্থ: “নিশ্চয়ই তোমাদের সর্বোত্তম সুরমা হচ্ছে ইসমিদ। ইহা দৃষ্টি শক্তি বাড়ায় এবং পলক উৎপন্ন করে।”

রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন-

ان النبى صلى الله عليه وسلم كانت له مكتحلة يكتحل منها كل ليلة ثلاثة فى هذه وثلاثة فى هذه.

অর্থ: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একটি সুরমা দানী মুবারক ছিল। তিনি তা থেকে প্রতি রাতে প্রত্যেক চোখ মুবারকে তিন তিন শলা করে সুরমা মুবারক ব্যবহার করতেন।” (শামায়িলে তিরমিযী শরীফ)

অপর একটি বর্ণনায় রয়েছে-

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يكتحل قبل ان ينام بالاثـمد ثلاثا فى كل عين

অর্থ: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ঘুমানোর পূর্বে প্রত্যেক চোখ মুবারকে ৩ শলা করে ইসমিদ সুরমা ব্যবহার করতেন।” (শামায়িলে তিরমিযী শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا اكتحل يكتحل فى اليمنى ثلاثة يبتدى بها ويـختم بـها وفى اليسرى ثنتين.

অর্থ : “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সুরমা ব্যবহার করতেন তখন ডান চোখ মুবারকে ৩ বার। যা শুরু করতে ডান চোখ মুবারক থেকে আবার শেষও করতেন ডান চোখ মুবারকে। আর বাম চোখ মুবারকে দিতেন ২ বার।”

অর্থাৎ প্রথমে ডান চোখ মুবারকে ২ বার এবং বাম চোখ মুবারকে ২ বার। অতঃপর ডান চোখ মুবারকে ১ বার।

(তিরমিযী শরীফ, মাযহারী শরীফ, ইবনে মাযাহ শরীফ, মুসনাদে আহমাদ শরীফ)