সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে তরতীব মুতাবিক পবিত্র মীলাদুন্নবী পালনের ব্যবস্থাকারী বাদশাহ ন্যায়পরায়ণ, দ্বীনদার, পরহেযগার ও আশিকে রসূল ছিলেন

পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরোধী বিদয়াতীরা পবিত্র মীলাদ শরীফকে বিদয়াত প্রমাণ করতে গিয়ে আরেকটি মিথ্যা তথ্য সংযুক্ত করে থাকে। তারা বলে, “পবিত্র মীলাদ শরীফ এর এরূপ তরতীব প্রচলন করেন ছয়শত হিজরীতে একজন ফাসিক বাদশাহ।” নাঊযুবিল্লাহ!
মূলত, তাদের উক্ত বক্তব্য মোটেও সত্য নয়; বরং সম্পূর্ণই মিথ্যা ও জিহালতপূর্ণ। কারণ নির্ভরযোগ্য সীরাত গ্রন্থসমূহ ও পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য সমস্ত কিতাবেই উক্ত বাদশাহকে নেক্কার, পরহেযগার, ছালেহীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেমন এ প্রসঙ্গে হাফিযে হাদীছ হযরত ইমাম যাহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার স্বীয় বিশ্বখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ “সিয়ারু আলাম আন নুবালা”-এর ২২তম জিঃ ৩৩৬ পৃষ্ঠায় লিখেন,

ﻛﺎﻥ ﻣﺘﻮﺍﺿﻌﺎ ﺧﻴﺮﺍ ﺳﻨﻴﺎ ﻳﺤﺐ ﺍﻟﻔﻘﻬﺎﺀ ﻭﺍﻟﻤﺤﺪﺛﻴﻦ

অর্থ: “বাদশাহ হযরত মালিক মুজাফফরুদ্দীন ইবনে যাইনুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি নম্র, ভদ্র, বিনয়ী ও উত্তম স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। তিনি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের আক্বীদায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ফক্বীহ ও মুহাদ্দিছগণকে অত্যন্ত ভাল বাসতেন।”

এ মহান বাদশাহর প্রশংসায় উনার সমকালীন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল্লামা ক্বাযী ইবনে হযরত খাল্লিক্বান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিখ্যাত কিতাব “ওয়াফইয়াতুল আ’ইয়ান” গ্রন্থের ৪র্থ জিঃ ১১৯ পৃষ্ঠায় লিখেন-

ﻭﻛﺮﻡ ﺍﻻﺧﻼﻕ ﻛﺜﻴﺮ ﺍﻟﺘﻮﺍﺿﻊ ﺣﺴﻦ ﺍﻟﻌﻘﻴﺪﺓ ﺳﺎﻟﻢ ﺍﻟﻄﺎﻗﺔ ﺷﺪﻳﺪ ﺍﻟﻤﻴﻞ ﺍﻟﻲ ﺍﻫﻞ ﺍﻟﺴﻨﺔ ﻭ ﺍﻟﺠﻤﺎﻋﺔ ﻻ ﻳﻨﻔﻖ ﻋﻨﺪ ﻣﻦ ﺍﺭﺑﺎﺏ ﺍﻟﻌﻠﻮﻡ ﺳﻮﻱ ﺍﻟﻔﻘﻬﺎﺀ ﻭﺍﻟﻤﺤﺪﺛﻴﻦ ﻭﻣﻦ ﻋﺪﺍﻫﻤﺎ ﻻ ﻳﻌﻄﻴﻪ ﺷﻴﺎ ﺍﻻ ﺗﻜﻠﻔﺎ

অর্থ: “বাদশাহ হযরত মুজাফফরুদ্দীন ইবনে যাইনুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রশংসনীয় বা উত্তম চরিত্রের অধিকারী, অত্যধিক বিনয়ী ছিলেন। উনার আক্বীদা ও বিশ্বাস ছিল সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ। তিনি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন।”

মহান বাদশা বিশুদ্ধ আক্বীদা এবং উত্তম আমলের অধিকারী ছিলেন বলেই সে জামানার সকল আলিম উলামা, মাশায়েখ, সূফী দরবেশ সবাই সে সময় উনার আয়োজিত মীলাদ শরীফ মাহফিল উনার মধ্যে উপস্থিত হতেন। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ক্বাযী ইবনে খল্লিক্বান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

ﻭﺍﻣﺎ ﺍﺣﺘﻔﺎﻝ ﺑﻤﻮﻟﺪ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻓﺎﻥ ﺍﻟﻮﺻﻒ ﻳﻘﺼﺮ ﻋﻦ ﺍﻻﺣﺎﻃﺔ ﺑﻬﺎ ﻭﻟﻜﻦ ﻧﺬﻛﺮ ﻃﺮﻗﺎ ﻣﻨﻪ ﻭﻫﻮ ﺍﻫﻞ ﺍﻟﺒﻼﺩ ﻛﺎﻧﻮﺍ ﻗﺪ ﺳﻤﻌﻮﺍ ﺑﺤﺴﻦ ﺍﻋﺘﻘﺎﺩ ﻓﻴﻪ ﻓﻜﺎﻥ ﻓﻲ ﻛﻞ ﺳﻨﺔ ﻳﺼﻞ ﺍﻟﻴﻪ ﻣﻦ ﺍﻟﺒﻼﺩ ﺍﻟﻌﺮﺑﻴﺔ ﻣﻦ ﺍﺭﺑﻞ ﻣﺜﻞ ﺑﻐﺪﺍﺩ ﻭﺍﻟﻤﻮﺻﻞ ﻭﺍﻟﺠﺰﻳﺮﺓ ﻭ ﺳﻨﺠﺎﺭ ﻭﻧﺼﺒﻴﻦ ﻭﺑﻼﺩﺍ ﺍﻟﻌﺠﻢ ﻭﺗﻠﻚ ﺍﻟﻨﻮﺍﺣﻲ ﺣﻠﻖ ﻛﺜﻴﺮ ﻣﻦ ﺍﻟﻔﻘﻬﺎﺀ ﻭﺍﻟﺼﻮﻓﻴﺔ ﻭﺍﻟﻮﻋﺎﺀﻅ ﻭﺍﻟﻘﺮﺍﺀ ﻭﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ

অর্থ: বাদশা হযরত মুজাফফরুদ্দীন ইবনে যাইনুদ্দীন রহমাতুল্লাহি আলাইহি কতৃক আয়োজিত মীলাদ মাহফিলের গুরুত্ব-মাহাত্ব বলে শেষ করার মত নয়। এতদসত্বেও একটি কথা না বললেই নয়। তাহলো দেশবাসী আক্বীদা ও বিশ্বাসে উনাকে উত্তম লোক বলেই জানতেন। আর তাই প্রতি বছর আরবলের নিকটবর্তী সকল দেশে যেমন-বাগদাদ, মাওয়াছিল, জাযীরাহ, সানজার, নাছীবাইন, আরব-অনারব ও আশ পাশের অসংখ্য আলীম উলামা, ফক্বীহ, ছালিহ, ওয়ায়িজ, ক্বারী ও শায়িরগন উক্ত মীলাদ শরীফ এর মাহফিলে উপস্থিত হতেন।”
[সূত্রঃ- ওয়াফইয়াতুল আ’ইয়ান, ৪র্থ খন্ড, ১১৭ পৃষ্ঠা]

বিখ্যাত তাফসীরকারক ও ইতিহাসবেত্তা আল্লামা হযরত ইমাদুদ্দীন ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিখ্যাত গ্রন্থ “আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”-এর ১৩তম জিঃ ১৭৪ পৃষ্ঠায় লিখেন-

أحد الاجواد والسادات الكبراء والملوك الامجاد له آثار حسنة وقد عمر الجامع المظفري بسفح قاسيون وكان قدهم بسياقه الماء إليه من ماء بذيرة فمنعه المعظم من ذلك واعتل بأنه قد يمر على مقابر المسلمين بالسفوح وكان يعمل المولد الشريف في ربيع الاول ويحتفل به احتفالا هائلا وكان مع ذلك شهما شجاعا فاتكا بطلا عاقلا عالما عادلا رحمه الله وأكرم مثواه وقد صنف الشيخ أبو الخطاب ابن دحية له مجلدا في المولد النبوي سماه التنوير في مولد البشير النذير فأجازه على ذلك بألف دينار وقد طالت مدته في الملك في زمان الدولة الصلاحية وقد كان محاصر عكا وإلى هذه السنة محمودالسيرة والسريرة قال السبط حكى بعض من حضر سماط المظفر في بعض الموالد كان يمد في ذلك السماط خمسة آلاف راس مشوى وعشرة آلاف دجاجة ومائة ألف زبدية وثلاثين ألف صحن حلوى

র্অথঃ “(মুযাফফর শাহ) ছলিনে একজন উদার/সহৃদয় ও প্রতাপশালী এবং মহমিান্বতি শাসক, যাঁর সকল কাজ ছলি অতি উত্তম। তনিি কাসইিউন-এর কাছে জামযে়া আল-মুযাফফরী নর্মিাণ করনেৃ..(প্রত)ি রবউিল আউয়াল মাসে তনিি জাঁকজমকরে সাথে মীলাদ শরীফ (মীলাদুন্নবী) উদযাপন করতনে। উপরন্তু, তনিি ছলিনে দয়ালু, সাহসী, জ্ঞানী, বদ্বিান ও ন্যায়পরায়ণ শাসক – রাহমিুহুল্লাহ ওয়া একরাম – শায়খ আবুল খাত্তাব রহমতুল্লাহি আলাইহি সুলতানরে জন্যে মওলদিুন্ নববী সর্ম্পকে একখানি বই লখিনে এবং নাম দনে ‘আত্ তানভরি ফী মওলদি আল-বাশরি আন্ নাযীর’। এ কাজরে পুরস্কারস্বরূপ সুলতান তাঁকে ১০০০ দনিার দান করনে। সালাহযি়া আমল র্পযন্ত তাঁর শাসন স্থায়ী হয় এবং তনিি ’আকা’ জয় করনে। তিনি সবার শ্রদ্ধার পাত্র থকেে যান।” আস সাবত এক ব্যক্তির কথা উদ্ধৃত করেন-যিনি সুলতানের আয়োাজত মওলুদ অনুষ্ঠানে যোগ দেন; ওই ব্যক্তি বলেন:
‘অনুষ্ঠানে সুলতান ভালভাবে রান্নাকৃত ৫০০০ ছাগল, ১০,০০০ মোরগ, ১ লক্ষ বৌল-র্ভতি দুধ এবং ৩০,০০০ ট্রে মষ্টিরি আয়োজন করতেন।”

এ মহান বাদশাহ বিশুদ্ধ আক্বীদা ও উত্তম আমলের অধিকারী ছিলেন এবং তিনি যে তরতীবে মীলাদ শরীফ-এর মাহফিল উদযাপন করতেন তা শরীয়তসম্মত ছিল বলেই সে যামানার প্রায় সকল আলিম-উলামা পীর-মাশায়িখ, ছূফী-দরবেশ, ক্বারী, ওয়ায়িজ উক্ত মীলাদ শরীফ-এর মাহফিলে উপস্থিত হতেন। সুবহানাল্লাহ!

তিনি আরো উল্লেখ করেন,

ﺍﻟﻤﻠﻚ ﺍﻟﻤﻈﻔﺮ ﺍﺑﻮ ﺳﻌﻴﺪ ﻛﻮﻛﺒﺮﻱ ﺍﺣﺪ
ﻟﻼﺟﻮﺍﺩ ﺍﻟﺴﺎﺩﺍﺕ ﺍﻟﻜﺒﺮﺍﺀ ﻭﺍﻟﻤﻠﻮﻙ
ﺍﻻﻣﺠﺎﺩﻟﺔ ﺍﺛﺮ ﺣﺴﻨﺔ

অর্থ: বাদশা হযরত মুজাফফরুদ্দীন ইবনে যাইনুদ্দীন আবু সাঈদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি দানশীল ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। সাথে সাথে তিনি সম্মানিত বাদশাও ছিলেন। উনার বহু পূন্যময় কাজের আলামত এখনও বিদ্যমান রয়েছে।” [ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৩ তম, খন্ড ১৩৬ পৃষ্ঠা]

আল্লামা হযরত ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উক্ত বাদশাহ সম্বন্ধে উনার‘হুসনুল মাক্বাছীদ ফী আমালিল মাওয়ালিদ’ কিতাবে সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিছ আল্লামা হযরত ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেন যে-
وكان شهما شجاعا بطلا عالما عادلا رحمه الله واكرم مثواه.

অর্থ: ‘তিনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, সাহসী, বীর্যবান, আলিম ও ন্যায় বিচারক ছিলেন। আল্লাহ পাক উনার উপর রহম করুন এবং উনাকে সম্মানিত বাসস্থান দান করুন।’

অতএব, উক্ত বাদশাহকে মূর্খ ও যিন্দীক অভিহিত করে শরীয়তের ফতওয়া মুতাবিক উলামায়ে ছূ’রা নিজেরাই মূর্খ ও যিন্দীক হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। কারণ, কেউ যদি কাউকে কোন অপবাদ দেয়, সে যদি তার উপযুক্ত না হয় তাহলে যে অপবাদ দিয়েছে সেটা তার উপরই বর্তাবে এবং উক্ত অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েই সে মৃত্যুমুখে পতিত হবে। নাঊযুবিল্লাহ! যেমন এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-

عن ابى الدرداء رضى الله تعالى عنه قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول ان العبد اذا لعن شيأ صعدت اللعنة الى السماء فتغلق ابواب السماء دونها ثم تهبط الى الارض فتغلق ابوابها دونها ثم تأخذ يمينا وشمالا فاذا لم تجد مساغا رجعت الى الذى لعن فاذا كان لذالك اهلا والا رجعت الى قائلها

অর্থ: “হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলতে শুনেছি, যখন কোন বান্দা কোন বস্তুকে অভিসম্পাত করে তখন সেই অভিসম্পাত আকাশে উঠে, তখন আকাশের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়, তখন সেই অভিসম্পাত যমীনের দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তখন যমীনের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর তা ডান দিকে ও বাম দিকে যায় এবং যখন সেখানেও কোন রাস্তা না পায়, শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, যার উপর অভিসম্পাত করা হয়েছে। যদি সে অভিসম্পাতের উপযুক্ত হয়, তবে তার উপর পতিত হয়; অন্যথায় অভিসম্পাতকারীর দিকেই ফিরে আসে।।” (আবূ দাউদ শরীফ)