মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে এই ধরা পৃষ্ঠে প্রেরণের সুসংবাদ পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী কিতাব সমূহে উল্লেখ করেছেন

মহান আল্লাহ্ পাক উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে এই ধরা পৃষ্ঠে প্রেরণের সুসংবাদ পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী কিতাব সমূহে উল্লেখ করেছেন। বর্ণিত হয়েছে যে, “ইয়েমেনের বাদশাহ আসআদ বিন কার্ব তুব্বা ইরাক ও সিরিয়া জয় করার উদ্দেশ্যে বের হলে পথিমধ্যে তিনি আমিয়া শহরে (যা বর্তমানে মদিনা শরীফ নামে পরিচিত) সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে সেটি দখল করে নেন এবং উনার পুত্রকে সেখানকার অধিকর্তা নিয়োগ করে দেশে ফিরে যান, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ষড়যন্ত্রের ফলে আসআদ বিন কার্ব তুব্বার পুত্র মারা যায়। পুত্র হত্যার সংবাদে তিনি এতই প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেন যে, আমিয়া নগরীকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে সমূলে উচ্ছেদ তথা ধ্বংস করার অভিপ্রায় নিয়ে পুনরায় আমিয়াতে আসেন এবং তার নিদের্শ মোতাবেক সেনাবাহিনী ধ্বংসলীলা শুরু করে, কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো উনার সেনাবাহিনী প্রত্যহ যেটুকু ধ্বংস করে, পরবর্তী দিন দেখা যায় তা পূনরায় পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। ফলশ্রুতিতে আসআদ বিন কার্ব তুব্বা ঘটনার মর্ম জানার জন্য উনার বন্দীকৃত লোকজনের মধ্যে যেসমস্ত তাওরাতপন্থী ইহুদী পন্ডিত ছিলেন তাদের নিকট এই অত্যাশ্চর্য ঘটনার কারণ জিজ্ঞেস করায় তারা বাদশাহ্ আসআদ বিন কার্ব তুব্বাকে বলেন যে, আপনি আপনার ইচ্ছানুযায়ী সবকিছু করতে পারলেও এই শহরের বিন্দুমাত্র ক্ষতি সাধন করতে পারবেন না। কেননা আখেরী জামানার প্রতিশ্রুত নবী ভবিষ্যতে এ শহরের আতিথ্য গ্রহণ করবেন। তখন আসআদ বিন কার্ব তুব্বা ইহুদীদের এ কথার সত্যতার প্রমাণ কোথায় রয়েছে তা জানতে চাইলে তারা তাদের প্রতি নাজিলকৃত তাওরাত কিতাবের কথা বললেন, এবং সত্যতা যাচাইয়ের প্রেক্ষিতে তাওরাত কিতাব সহ দু’জন তাওরাত পন্থীকে অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করার নির্দেশ দেয়া হলে দেখা গেল যে, তাওরাত পন্থী দু’ব্যক্তি কিতাব সহ সেই জলন্ত অগ্নিকুন্ড থেকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে আসেন। অথচ আসআদ বিন কার্ব তুব্বা যখন তার দুই অগ্নিপূজক অনুচরকে তাঁদের অগ্নিদেবের মূর্তিসহ অগ্নি কুন্ডে প্রবেশ করতে বললেন তখন দেখা গেলো যে, তারা অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করার পূর্বেই তাদের সমস্ত শরীর ঝলসে গেল।

এসব ঘটনা অবলোকন করে বাদশাহ আসআদ বিন র্কাব তুব্বা সম্পূর্ণ অন্য মানুষে পরিনত হন এবং পবিত্র শহরে ধ্বংসের ব্যর্থ কোশেশের জন্যে তীব্র অনুশোচনায় পাপ খন্ডানোর নিমিত্তে তার বন্দীকৃতদের মধ্যে থেকে তাওরাত কিতাবের উপর পান্ডিত্যের অধিকারী চারশত ইহুদি আলিমকে মুক্তি দিয়ে তাদের কে আমিয়া নগরীতে স্থায়ী ভাবে বসবাস করার বন্দোবস্ত করে দেন এবং তাদের মধ্যকার নেতা শাহাউল নামক জনৈক আলেমকে প্রতিশ্রুত রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-্উনার নিকট তার লেখা একটি চিঠি দেন এবং আদেশ করেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হায়াত মোবারকে যদি এ শহরে আগমন করেন তবে যেন তিনি এই চিঠিটি উনার হাত মুবারকে দেন। যদি উনার হায়াত মোবারকে না আসেন তবে যেন চিঠিটি ইন্তেকালের পূর্বে উনার পুত্রের নিকট দিয়ে যান, এভাবে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার আগমন না ঘটা পর্যন্ত যেন বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে। বাদশাহ আসআদ বিন কার্ব তুব্বা আরো বলে দেন যে, তিনি শাহাউলের জন্য যে বাড়ীটি নির্মান করে দিয়েছেন, হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন শহরে তাশরীফ মুবারক আনবেন তখন যেন তিনি ঐ বাড়ীতেই অবস্থান মুবারক করেন  এবং এজন্য তিনি যেন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে অনুরোধ করেন।

৬২২ খ্রীষ্টাব্দের হজ্ব মৌসূমে মদীনা থেকে ৭৩ জন মুসলিমের একটি দল রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পবিত্র মদিনা শরীফ উনার অতীথি হবার অনুরোধ জানিয়ে পবিত্র মদীনাবাসীদের একটি আমন্ত্রণ নামা পেশ করে। উক্ত প্রতিনিধি দলে আবু লাইল নামে এক যুবক ছিলো, সে ছিলো সেই শাহাউল যাঁর নিকট রাসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- উনার কাছে লিখিত বাদশাহ আসআদ বিন কার্ব তুব্বার চিঠিও অর্পিত ছিলো, উনার বংশধর আবু আইয়ুব আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার পুত্র আবু লাইল যখন উক্ত প্রতিনিধি দলের সাথে যাচ্ছিলেন তখন আবু আইয়ুব আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অত্যন্ত গোপনে উনার পুত্রের হাতে চিঠিটি দিয়ে বললেন যে, উনি যেন চিঠিটির কথা গোপন রাখে এবং যদি রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চিঠিটির কথা জিজ্ঞেস না করেন তবে যেন এ ব্যাপারে কিছু বলা না হয় এবং চিঠি ফেরৎ নিয়ে আসে। অথচ দেখা গেলো উক্ত প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছে আসলে তিনি আবু লাইল-এর দিকে আঙ্গুলনিদের্শ করে বললেন, তোমার নামতো আবু লাইল, তোমার কাছে বাদশাহ্ আসআদ বিন কার্ব তুব্বা কর্তৃক আমার জন্য লিখিত পত্র খানি লুকায়িত আছে। উহা বের কর। একথায় উপস্থিত সকলেই আশ্চর্যান্বিত হল।: অতপর আবু লায়লা চিঠিটি বের করে নিজেই উচ্চস্বরে জনসম্মুখে পড়ে শুনালো। চিঠি পড়ে সকলেই অবহিত হলো যে, এটি প্রায় ১৪০০ বৎসর পূর্বে লেখা। চিঠিটি ছিলো এই-

“হে সাইয়্যিদুনা হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার প্রতি দরুদ ও সালামের পর আমি এই মর্মে ঘোষনা করছি যে, আমি আপনার এবং মহান আল্লাহ্ পাক উনার কর্তৃক আপনার প্রতি যাবতীয় বিষয়ের উপর ঈমান আনলাম। আমি আরও ঘোষনা করছি, আমি আপনার ধর্মে ধর্মান্তরিত হলাম, অর্থাৎ আপনার দ্বীনকে গ্রহণ করলাম এবং আপনার সৃষ্টিকর্তার উপর ঈমান আনলাম এবং আল্লাহ পাক উনার নিকট হতে আপনার জন্য ইসলামী শরীয়তের যে সমস্ত আইন বলবৎ রবে তাও মেনে নিলাম।
আমি প্রার্থনা করছি, শেষ বিচারের দিন আপনি যেন আমাকে শাফায়াত দান করেন এবং ঐ দিন যেন আমাকে ভুলে না যান। আমি আপনার প্রথম উম্মত ও অনুসারী হলাম। আপনার নিকট আমার দাবী আরো জোরদার করার লক্ষ্যে, আমি আপনার পূর্ব পুরুষ ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম উনার ধর্মে দীক্ষিত হলাম এবং সেই ধর্মানুযায়ী আমি বর্তমান জীবন যাপন করছি।”
এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন পবিত্র মদীনা শরীফ উনার মাঝে হিজরত মুবারক করেন তখন পবিত্র মদীনা শরীফ উনার সমস্ত মুসলমানই উনাদের নিজ নিজ বাড়িতে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে অবস্থান নিতে অনুরোধ জানান, এতে করে সকলের মন রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- আমার উট সেচ্ছায় যে বাড়ীর সম্মুখে অবস্থান নিবে সে বাড়িতেই আমি অবস্থান নিবো। দেখা গেলো উটটি তার নিজের ইচ্ছায় আবু লাইল-এর পিতা হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু- উনার বাড়ীর সম্মুখে বসে পড়লো যা কিনা রাজা আসআদ বিন কার্ব তুব্বা ১৪০০ বৎসর পূর্বে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার বসবাসের জন্য বিশেষ ভাবে নির্মান করেছিলেন।(সুবহানাল্লাহ্)

অর্থাৎ বিষয়টা হচ্ছে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সবকিছুর পূর্বে নূর, নবী, রসূল, রহমত, নিয়মাত ইত্যাদি করে সৃষ্টি করে মহান আল্লাহ পাক নিজের কুদরত মুবারকে মওজুদ রেখেছেন। আর উনার আগমন মুবারক হচ্ছে সবচাইতে বড় নিয়ামত। যেই সুসংবাদ মহান অাল্লাহ পাক অসংখ্যবার দিয়েছেন। উনাকে পাওয়ার কারনে খুশি মুবারক প্রকাশ করাই সবচাইতে বড় আমল। সুবহানাল্লাহ্ !! (তাফরিহুল আজকিয়া ফি আহ্ওয়ালিল আম্বিয়া” নামক কিতাবের ২য় খন্ড ১১০ পৃষ্ঠা)