মোল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার “আল মাওরিদুর রাভী” কিতাবে ঈদে মিলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের দলীল

মোল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার “আল মাওরিদুর রাভী” কিতাবে ঈদে মিলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের দলীল

বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ হযরত মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি ইলমে হাদীছ শরীফ উনার ইলম হাছিলের জন্য পবিত্র মক্কা শরীফ ও পবিত্র মদীনা শরীফ সব স্থানে ভ্রমন করেন। তিনি সারাজীবন অসংখ্য কিতাব রচনা করে মুসলিম জাহানের জন্য এক বিশাল নিয়ামত রেখে গিয়েছেন। উনার সে অসংখ্য কিতাবের মধ্যে একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক গ্রন্থের নাম হচ্ছে “মাওরিদুর রাভী ফি মাওলিদিন নাবী”।

এ কিতাবে তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ তথা পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ থেকে দলীল পেশ করেছেন এবং সেই সাথে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ করেছেন যে, সারা পৃথিবীর সকল দেশে জাঁকজমকের সাথে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন হতো। উক্ত কিতাব থেকে সে ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলো উল্লেখ করা হলো-

(১) সম্মানিত মক্কা শরীফ উনার অধিবাসী উনাদের মীলাদ শরীফ মাহফিল : আমাদের মাশায়েখ উনাদের ইমাম শায়খ শামসুদ্দিন মুহম্মদ সাখাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, পবিত্র মক্কা শরীফ উনার মধ্যে মীলাদ শরীফ অনুষ্ঠানে যারা কয়েক বছর উপস্থিত ছিলেন, আমি তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। আমরা মীলাদ শরীফ অনুষ্ঠানের বরকত অনুভব করছিলাম যা নির্দিষ্ট কয়েক ব্যক্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়।
এ অনুষ্ঠানের মধ্যেও নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের মুবারক স্থান উনার যিয়ারত আমার কয়েকবার নসীব হয়েছে। আল্লামা সাখাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আরো বলেন, সম্মানিত মক্কা শরীফ উনার অধিবাসী উনারা বরকত ও কল্যাণের খনি। উনারা উক্ত প্রসিদ্ধ পবিত্র স্থানের প্রতি বিশেষ মনোনিবেশ করেন, যেটা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের মুবারক স্থান। এটা সাউকুল লাইলে অবস্থিত। যাতে উনার বরকতে প্রত্যেকের উদ্দেশ্য সাধিত হয়। এসব লোক পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দিন আরো অনেক কিছুর আয়োজন করে থাকেন। এ আয়োজনে আবেদ, নেককার, পরহিজগার, দানবীর কেউই বাদ যান না। বিশেষ করে হিজাজের আমীর বিনা সংকোচে সানন্দে অংশগ্রহণ করেন এবং উনার আগমন উপলক্ষ্যে ওই জায়গায় এক বিশেষ নিশান তৈরী করা হতো। পরবর্তীতে এটি পবিত্র মক্কা শরীফ উনার বিচারক ও বিশিষ্ট আলিম আল-বুরহানিশ শাফেয়ী তিনি পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে আগত যিয়ারতকারী খাদিম ও সমবেত লোকদের খানা ও মিষ্টি খাওয়ানো পছন্দনীয় কাজ বলে রায় দিয়েছেন।

(২) সম্মানিত মদীনা শরীফ উনার অধিবাসী উনাদের মীলাদ শরীফ মাহফিল : সম্মানিত মদীনা শরীফ উনার অধিবাসী উনারাও মীলাদ শরীফ মাহফিলের আয়োজন করতেন এবং অনুরূপ অনুষ্ঠানাদি পালন করতেন। বাদশাহ মোজাফফর শাহ আরিফ অধিক আগ্রহী এবং সীমাহীন আয়োজনকারী ছিলেন।
হযরত ইমাম আবূ শামা রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অন্যতম উস্তাদ এবং বিশেষ বুযূর্গ ছিলেন, স্বীয় কিতাব “আল বায়াছ আলাল কদয়ে ওয়াল হাওয়াদিছ” উনার মধ্যে বাদশাহের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন এরকম ভালো কাজ সমূহ উনার খুবই পছন্দ এবং তিনি এ ধরনের অনুষ্ঠান পালনকারীদের উৎসাহ প্রদান ও প্রশংসা করতেন। ইমাম জাজরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আরো সংযোজন করে বলেন, এসব অনুষ্ঠানাদী পালন করার দ্বারা শয়তানকে নাজেহাল এবং ঈমানদারদের উৎসাহ উদ্দীপনা দানই উদ্দেশ্যে হওয়া চাই।

(৩) মিসর ও সিরিয়াবাসীর মীলাদ শরীফ মাহফিল : পবিত্র মীলাদ শরীফ মাহফিলে সবচাইতে অগ্রগামী ছিলেন মিসর ও সিরিয়াবাসী। মিসরের সুলতান প্রতি বছর পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের রাত্রে মীলাদ শরীফ মাহফিলের আয়োজনের অগ্রণী ভূমিকা রাখতেন।

ইমাম শামসুদ্দীন সাখাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন আমি ৭৮৫ হিজরীতে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রাতে সুলতান বরকুকের উদ্যোগে আলজবলুল আলীয়া নামক কেল্লায় আয়োজিত পবিত্র মীলাদ শরীফ মাহফিলে হাজির হয়েছিলাম। ওখানে আমি যা কিছু দেখেছিলাম, তা আমাকে অবাক করেছে, অসীম তৃপ্তি দান করেছে। কোনোকিছুই আমার কাছে অস্বস্থিকর লাগেনি। সে পবিত্র রাতে বাদশাহর ভাষণ, উপস্থিত বক্তাগণের বক্তব্য, ক্বারীগণের তিলাওয়াতে কুরআন শরীফ এবং না’ত শরীফ পাঠকারীগণের না’ত শরীফ আমি সাথে সাথে লিপিবদ্ধ করে নিয়েছি।

(৪) স্পেন ও পাশ্চাত্য দেশে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন : স্পেন ও পাশ্চাত্য শহরগুলোতে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রাতে রাজা বাদশাহগণ জুলুস বের করতেন। সেথায় বড় বড় ইমাম ও উলামায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা অংশগ্রহণ করতেন। মাঝ পথে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক এসে উনাদের সাথে যোগ দিতেন এবং কাফিরদের সামনে সত্য দাওয়াত তুলে ধরতেন। আমি যতটুকু জানি, রোমবাসীগণও কোন অংশে পিছিয়ে ছিলো না। তারাও অন্যান্য বাদশাহগণের মতো পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাহফিলের আয়োজন করতেন।

(৫) অনারব দেশে তথা ভারতবর্ষে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম : আরব ছাড়াও অনারবে মীলাদ শরীফ মাহফিলের প্রচলন ছিলো মহাসমারোহে। যেমন- পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাসে এবং মহিমান্বিত দিনে এসকল এলাকার অধিবাসীদের ‘মীলাদ শরীফ মাহফিল’ নামে জাঁকজমক পূর্ণ মজলিসের আয়োজন হতো, গরীব মিসকিনদের মধ্যকার বিশেষ ও সাধারণ সকলের জন্য বহু ধরণের খাবারের বন্দোবস্ত করা হতো।
তাতে ধারাবাহিক তিলাওয়াত, বহু প্রকার খতম এবং উচ্চাঙ্গ ভাষায় প্রশংসা সম্বলিত কবিতা আবৃত্তি হতো। বহু বরকতময় ও কল্যাণময় আমলের সমাহার ঘটতো বৈধ পন্থায়, আনন্দ প্রকাশ করা হতো, বহু বিখ্যাত আলিমগণও তাতে অংশগ্রহণ করতেন। মুঘল বাদশাহ হুমায়ুনও বিশাল জাকজমকের সাথে প্রতিবছর পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাহফিলের আয়োজন করতেন।

(আল মাওরিদুর রাভী ফি মাওলিদিন নাবিয়্যি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। লেখক– ইমামুল মুহাদ্দেসীন হযরত মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী রহমাতুল্লাহি আলাইহি।)