নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখন থেকে নবী – রসূল এ প্রসঙ্গে

সুওয়াল: কেউ বলে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ৪০ বৎসর বয়স মুবারক-এ নুবুওওয়াত লাভ করেছেন। আবার কেউ বলে, তিনি নবী-রসূল হিসেবেই সৃষ্টি হয়েছেন অর্থাৎ সৃষ্টির শুরু হতেই তিনি নবী ও রসুল। এ বিষয়ে দলীলভিত্তিক জাওয়াব জানতে ইচ্ছুক।

জাওয়াব: পবিত্র হাদীছে কুদছীতে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

كنت كنزا مخفيا فاحببت ان اعرف فخلقت الخلق لاعرف

অর্থ: “আমি গোপন ছিলাম। যখন আমার মুহব্বত হলো যে, আমি প্রকাশিত হই, তখনই আমি সৃষ্টি করলাম মাখলূক্ব অর্থাৎ আমার হাবীব, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে।” (আল মাক্বাছিদুল হাসানা ৮৩৮, কাশফুল খিফা-২০১৩, তমীযুত্তীব-১০৪৫, আসরারুল মারফুয়া-৩৩৫, তানযিয়াতুশ শরীয়াহ, আদ্দুরারুল মুন্তছিরা-৩৩০, আত্তাযকিরা ফি আহাদীছিল মুশতাহিরা)

অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اول ما خلق الله نورى وخلق كل شىء من نورى

অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম আমার নূর মুবারক সৃষ্টি করেছেন এবং উনার থেকেই সমস্ত কায়িনাত সৃষ্টি করেছেন।” (নূরে মুহম্মদী, আল ইনসানুল কামিল, হাক্বীক্বতে মুহম্মদী)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত রয়েছে-

عن حضرت ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم كنت اول النبين فى الخلق واخرهم فى البعث.

অর্থ: “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, হাবীবুল্লাহ, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, সৃষ্ট জীবের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম নবী হিসাবে সৃষ্টি হয়েছি। কিন্তু আমি প্রেরিত হয়েছি সব নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের শেষে।” (তাফসীরে বাগবী শরীফ ৫/২৩২, দুররে মানছূর শরীফ ৫/১৮৪, শিফা ১/৪৬৬, মানাহিলুচ্ছফা ৫/৩৬, কানযুল উম্মাল শরীফ ৩১৯১৬, দাইলামী শরীফ ৪৮৫০) মিরকাত শরীফ ১১/৫৮)

আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت عبد الله بن عمر رضى الله تعالى عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اول شىء خلق الله القلم من نور واحد.

অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, মহান আল্লাহ পাক প্রথমে কলম সৃষ্টি করেছেন একখানা নূর মুবারক (নূরে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার) হতে।” (ইবনে আবি হাতিম শরীফ ১-৯, আহমদ শরীফ ৫-২১৭১, আত্ তয়ালিস ৫৭৭, তিরমিযী শরীফ ২-২৩, দাইলামী শরীফ-২)

এ সম্পর্কে অন্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, মহান আল্লাহ পাক তিনি যখন প্রথম মানব, প্রথম নবী ও প্রথম রসূল হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে যমীনে প্রেরণ করেন, তখন তিনি দুশ থেকে তিনশত বছর যাবৎ দোয়া ও কান্নাকাটি করার পর বলেন-

يا رب اغفرلى بحق محمد صلى الله عليه وسلم قال الله تعالى يا ادم عليه السلام كيف عرفت محمدا صلى الله عليه وسلم قال لانك لـما خلقتنى بيدك ونفخت فى من روحك رفعت راسى فرايت على قوائم العرش مكتوبا لا اله الا الله محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم فعلمت انك لـم تضف الى اسمك الا احب الخلق اليك قال الله تعالى صدقت يا ادم لولا محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم ما خلقتك.

অর্থ: “হে মহান আল্লাহ পাক! আপনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ওসীলায় আমার দোয়া কবুল করুন। তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, হে হযরত আদম আলাইহিস সালাম! আপনি কিভাবে আমার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে চিনলেন? উত্তরে হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, আয় মহান আল্লাহ পাক! আপনি যখন আমাকে কুদরতী হাত মুবারক-এ তৈরি করে আমার মধ্যে রূহ মুবারক ফুঁকে দিলেন, তখন আমি মাথা মুবারক উত্তোলন করে দেখলাম আপনার পবিত্র আরশে মুয়াল্লা উনার স্তম্ভে লিখা রয়েছে-

لا اله الا الله محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم

তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, আপনার নাম মুবারক উনার সাথে যাঁর নাম মুবারক লিখা রয়েছে, তিনিই আপনার সবচেয়ে বেশি খাছ ও প্রিয় বান্দা হবেন। তাই আমি উনার ওসীলা দিয়ে আপনার নিকট দোয়া চেয়েছি।

তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে লক্ষ্য করে বলেন, “আপনি সত্যই বলেছেন। যদি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সৃষ্টি না করতাম তবে আপনাকেও সৃষ্টি করতাম না।” সুবহানাল্লাহ! (আল্ মুস্তাদারক লিল হাকিম শরীফ, আছ ছহীহাহ্ শরীফ, মুখতাছারুল মুস্তাদরাক শরীফ, আত্ তাওয়াস্সুল, আদ্ দুররুল মানছূর শরীফ, কানযুল উম্মাল শরীফ)

عن حضرت ميسرة الفجر رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم كنت نبيا وادم بين الروح والجسد.

অর্থ: “হযরত মাইসারাতুল ফাজর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, আমি তখনো নবী ছিলাম যখন হযরত আদম আলাইহিস সালাম রূহ মুবারক ও শরীর মুবারক উনার মধ্যে ছিলেন।” (তারীখে বুখারী, আহমদ শরীফ, আলহাবী, ইত্তেহাফুচ্ছাদাত, তাযকিরাতুল মাউজুয়াত শরীফ, কানযুল উম্মাল শরীফ, দাইলামী শরীফ, ত্ববরানী শরীফ, আবু নঈম শরীফ, মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ ১১/৫৮)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

كنت نبيا وادم بين الـماء والطين

অর্থ: আমি তখনো নবী ছিলাম যখন হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি পানি ও মাটিতে ছিলেন। (মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ ১১/৫৮)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت جابر رضى الله تعالى عنه قال قلت يا رسول الله بابى انت وامى اخبرنى عن اول شىء خلق الله تعالى قبل الاشياء قال يا جابر ان الله تعالى قد خلق قبل الاشياء نور نبيك

অর্থ: “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি আমাকে জানিয়ে দিন যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি সর্বপ্রথম কোন জিনিস সৃষ্টি করেছেন? তিনি বললেন, হে হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি সবকিছুর পূর্বে আপনার নবী পাক, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূর মুবারক সৃষ্টি করেছেন।”

প্রখ্যাত ও মশহূর তাফসীরকারক হযরত আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মশহূর ও বিখ্যাত “তাফসীরে রুহুল বয়ান শরীফ-এ” একখানা পবিত্র হাদীছ শরীফ উল্লেখ করেন-

عن حضرت ابى هريرة رضى الله تعالى عنه انه عليه الصلاة والسلام سال جبريل عليه السلام فقال يا جبريل كم عمرك من السنين فقال يا رسول الله صلى الله عليه وسلم لست اعلم غير ان فى الحجاب الرابع نجما يطلع فى كل سبعين الف سنة مرة رايته اثنين وسبعين الف مرة فقال يا جبريل عليه السلام وعزة ربى انا ذلك الكوكب.

অর্থ: “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একদিন কথা প্রসঙ্গে হযরত জিবরায়ীল আলাইহিস সালাম উনার বয়স মুবারক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, জবাবে হযরত জিবরায়ীল আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, আমি শুধু এতটুকু জানি যে, মহান আল্লাহ পাক উনার হিজাবে আযমত উনার চতুর্থ হিজাব মুবারক-এ একটি নূরানী তারকা ৭০ হাজার বৎসর পরপর একবার উদয় হতো, আমি সে তারকাটি ৭২ হাজার বার উদয় হতে দেখেছি। তখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! আমিই সেই নূরানী তারকা।” অর্থাৎ ঐ তারকা মুবারকই হলেন নূরে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি।

উপরোক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার আলোচনা দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন হুযুুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সমগ্র কায়িনাত সৃষ্টির পূর্বে নবী ও রসূল হিসাবে সৃষ্টি হয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!

অর্থাৎ নূরে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিই মহান আল্লাহ পাক উনার নবী, রসূল ও হাবীব আর তিনিই মহান আল্লাহ পাক উনার সর্বপ্রথম সৃষ্টি।

তবে চল্লিশ বৎসর দুনিয়াবী বয়স মুবারক-এ আনুষ্ঠানিকভাবে নুবুওওয়াত ও রিসালত প্রকাশ করা হয়েছে বা তিনি যে মহান আল্লাহ পাক উনার নবী, রসূল ও হাবীব সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে কুল কায়িনাতকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।