নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্ব পুরুষ উনাদের মধ্যে কেউ মূর্তিপূজক তথা কাফির-মুশরিক থাকার বিষয়টি কতটুকু শুদ্ধ?

হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রত্যেকেই খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে এরূপভাবে মনোনীত যে, উনাদের কারো পিতা-মাতা পর্যন্ত কেউই কাফির কিংবা মুশরিক ছিলেন না। বরং উনাদের মধ্যে অনেকে নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন আর যাঁরা নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না উনারা ঈমানদার তো অবশ্যই উপরন্তু উনারা ছিলেন উনাদের যুগে মহান আল্লাহ পাক উনার লক্ষস্থল বান্দা ও ওলী উনাদের অন্তর্ভুক্ত। এটাই হচ্ছে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা ও ক্বিয়াস উনাদের মত এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ উনাদের মত। এ মতের বিপরীত মত, অর্থ, ব্যাখ্যা, বক্তব্য, লিখনী সবই কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।
প্রকৃতপক্ষে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা ছিলেন পরিপূর্ণ দ্বীনদার, পরহেযগার, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মত ও পথের পরিপূর্ণ অনুসারী একজন খালিছ ঈমানদার।
সর্বোপরি তিনি ছিলেন খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার রুবূবিয়াত প্রকাশের মহানতম ওসীলা। কেননা সমগ্র মাখলূক্বাত বা কায়িনাত সৃষ্টির যিনি মূল উৎস সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র ওজুদ ‘নূর’ মুবারক উনার একজন মহান ধারক-বাহক।
হযরত আদম ছফীউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার থেকে শুরু করে যে সকল মনোনীত ও সম্মানিত পুরুষ-মহিলা আলাইহিমুস সালাম ও আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের মাধ্যমে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র ওজুদ ‘নূর’ মুবারক হযরত আব্দুল্লাহ যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম এবং হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম উনাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে উনারা সকলেই ছিলেন সর্বকালের সর্বযুগের শ্রেষ্ঠতম পবিত্রতম সুমহান ব্যক্তিত্ব। উনাদের মধ্যে কেউই কাফির, মুশরিক বা বেদ্বীন ইত্যাদি ছিলেননা। উনারা সকলেই ছিলেন খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত খাছ বান্দা-বান্দি উনাদের অন্তর্ভুক্ত।
মূলত যারা হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা বা পরিবারকে মূর্তিপূজক হিসেবে অভিহিত করে কুফরী কাজটি করে থাকে তারা পবিত্র হাদীছ শরীফ ও পবিত্র তাফসীর শরীফ উনাদের সম্পর্কে নেহায়েত অজ্ঞ ও জাহিল হওয়ার কারণেই করে থাকে। এছাড়া তারা মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার মহানতম ও পবিত্রতম শান, মান, মর্যাদা, মর্তবা সম্পর্কে এবং উনার সুমহান পরিচয় সম্পর্কে চরম অজ্ঞ ও গ- মূর্খ হওয়ার কারণে এবং পবিত্র সূরা আনআম শরীফ উনার ৭৪ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ব্যবহৃত لابيه ازر উনার মূল ও সঠিক অর্থ যা পবিত্র হাদীছ শরীফ ও পবিত্র তাফসীর শরীফ উনাদের মধ্যে বর্ণিত রয়েছে তা গ্রহণ না করে তার বিপরীতে শুধুমাত্র আভিধানিক বা শাব্দিক অর্থের উপর ভিত্তি করে অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করার কারণে করে থাকে। যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
অথচ পবিত্র কুরআন শরীফ উনার পবিত্র আয়াত শরীফসমূহ উনাদের অর্থ ও ব্যাখ্যা কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যক্তির শান বা মর্যাদা অনুযায়ী করতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে পবিত্র হাদীছ শরীফ অনুযায়ী যে অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়েছে সে অনুযায়ী অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে অনুসরণীয় হযরত মুফাসসিরীনে কিরাম উনারা যে অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন, সে অনুযায়ী অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে হবে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে পবিত্র কালাম উনার শান বজায় রেখে শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থ ও ব্যাখ্যাও গ্রহণ করতে হবে। তবে সবক্ষেত্রে শাব্দিক অর্থ ও ব্যাখ্যা আদৌ গ্রহণীয় ও অনুসরণীয় নয়। বরং ক্ষেত্র বিশেষ তা কুফরী এবং কাফির ও জাহান্নামী হওয়ার কারণও বটে।
যেমন মহান আল্লাহ পাক উনার শান মুবারকে পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ ৫৪নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ব্যবহৃত مكر শব্দ মুবারক উনার আভিধানিক বা শাব্দিক অর্থ ‘ধোকাবাজির’ পরিবর্তে ‘হিকমত’ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় কুফরী হবে।
অনুরূপভাবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারকে পবিত্র সুরা দ্বুহা শরীফ উনার মধ্যে ব্যবহৃত ضالا শব্দ মুবারক উনার শাব্দিক অর্থ ‘বিভ্রান্ত’ গ্রহণ না করে বরং তার পরিবর্তে ‘কিতাববিহীন’ অর্থ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় কুফরী হবে।
একইভাবে পবিত্র সূরা হিজর শরীফ ৯৯নং আয়াত শরীফ উনার মধ্যে اليقين শব্দ মুবারক উনার শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থ ‘বিশ্বাস’ গ্রহণ না করে ‘মৃত্যু’ অর্থ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় কুফরী হবে। এমনি ধরনের আরো বহু পবিত্র আয়াত শরীফ রয়েছে যাদের শুধুমাত্র আভিধানিক অর্থের উপর ভিত্তি করে অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হলে অশুদ্ধ ও কুফরী হবে। যেরূপ কুফরী হয়েছে পবিত্র সূরা আনআম শরীফ উনার ৭৪ নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখিত اب (আবুন) শব্দ মুবারক উনার শাব্দিক অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করে।
যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
واذ قال ابرهيم لابيه ازر اتتخذ اصناما الـهة.
অর্থ : “আর যখন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তিনি স্বীয় চাচা আযরকে বললেন, আপনি কি মূর্তিকে ইলাহ (মা’বুদ) হিসেবে গ্রহণ করছেন?” (পবিত্র সূরা আনআম শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭৪)
এ আয়াত শরীফেابيه উনার মধ্যে اب (আবুন) শব্দ মুবারক উনার শাব্দিক একটি অর্থ ‘পিতা’ গ্রহন করে বলা হচ্ছে ‘আযর’ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পিতা। কিন্তু হযরত ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরামগণ উনাদের সর্বসম্মত মতে, এখানে ابيه শব্দ মুবারক উনার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ‘আযর’ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা। অর্থাৎ উদ্ধৃত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে اب (আবুন) শব্দ মুবারক উনার অর্থ পিতা না হয়ে উনার অর্থ হবে চাচা। কারণ, পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার অনেক স্থানেই اب (আবুন) শব্দটি পিতা ব্যতীত অন্য অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে।
যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
ام كنتم شهداء اذ حضر يعقوب الموت اذ قال لبنيه ما تعبدون من بعدى قالوا نعبد الـهك واله ابائك ابرهيم واسمعيل واسحق الـها واحدا.
অর্থ : “তোমরা কি উপস্থিত ছিলে? যখন হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম উনার বিছাল শরীফ গ্রহণের সময় উপস্থিত হলো তখন তিনি উনার সন্তানগণ উনাদেরকে বললেন, ‘আপনারা আমার পর কার ইবাদত করবেন? উনারা উত্তরে বললেন, ‘আমরা আপনার রব তায়ালা উনার এবং আপনার পূর্ব পিতা (আপনার দাদা) হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার এবং (আপনার চাচা) হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার এবং (আপনার পিতা) হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম উনার একক রব খালিক্ব মালিক মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত করবো।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৩৩)
এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে اب (আবুন) দ্বারা দাদা, চাচা ও পিতা সকলকে বুঝানো হয়েছে। যেমন, এ সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ ‘তাফসীরে মাযহারী’ উনার ৩য় খ-ের ২৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-
وكان ازر على الصحيح عما لابراهيم والعرب يطلقون الاب على العم كما فى قوله تعالى نعبد الـهك واله ابائك ابراهيم واسماعيل واسحاق الـها واحدا.
অর্থ : “বিশুদ্ধ মতে, আযর ছিলো হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা। আর আরবরা চাচাকেও اب (আবুন) শব্দে অভিহিত করে থাকে।” যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, আমরা আপনার প্রতিপালক ও আপনার পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম, হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ও হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম উনাদের একক প্রতিপালক মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত করবো।”
“তাফসীরে মাযহারী” কিতাব উনার ৩য় খ-ের ২৫৬ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ রয়েছে-
والعرب يطلقون الاب على العم.
অর্থ : “আরববাসীরা الاب (আল আবু) শব্দটি চাচার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেন।” তাফসীরে কবীর কিতাবের ১৩তম খ-ের ৩৮ পৃষ্ঠায়ও অনুরূপ উল্লেখ রয়েছে।
সুতরাং, পবিত্র সূরা আনআম শরীফ উনার ৭৪নং আয়াত শরীফে ابيه ازر এর অর্থ হলো আযর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা। উনার পিতা নন।
এ সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে এসেছে-
عن حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنه ان ابا ابراهيم عليه السلام لم يكن اسمه ازر وانما كان اسمه تارح.
অর্থ : “রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পিতার নাম আযর নয়। বরং উনার পিতার নাম মুবারক হলো হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম।” (ইবনে আবি হাতিম শরীফ, ইবনে কাছীর শরীফ- ৩/২৪৮)
এ সম্পর্কে তাফসীরে কবীর শরীফ ১৩/৩৮ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ রয়েছে-
ان والد ابراهيم عليه السلام كان تارح وازر كان عما له والعم قد يطلق عليه اسم الاب.
অর্থ : “নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা ছিলেন হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম। আর আযর ছিলো উনার চাচা। এবং আম্মুন (চাচা) শব্দটি কখনও ‘ইসমুল আব’ অর্থাৎ পিতা নামে ব্যবহৃত হয়।”
উক্ত কিতাবে আরো উল্লেখ রয়েছে-
ان والد ابراهيم عليه السلام ما كان مشركا وثبت ان ازر كان مشركا فوجب القطع بان والد ابراهيم كان انسانا اخر غير ازر.
অর্থ : “নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পিতা (হযরত তারাখ আলাইহিস সালাম) মুশরিক ছিলেননা। বরং আযর (উনার চাচা) মুশরিক ছিল। কেননা, অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস্ সালাম উনার পিতা আযর নয়। বরং অন্য একজন অর্থাৎ হযরত তারাখ বা তারাহ আলাইহিস সালাম।” (তাফসীরে কবীর শরীফ- ১৩/৩৯)
তাফসীরে মাযহারী- ৩/২৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-
ليس ازر ابا لابراهيم انما هو ابراهيم بن تارح.
অর্থ : “আযর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পিতা নয়। বরং নিশ্চয়ই তিনি (হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম) হলেন হযরত তারাখ বা তারাহ আলাইহিস সালাম উনার সুযোগ্য সন্তান।”
তাফসীরে মাযহারী- ৩/২৫৬ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছে-
وفى القاموس ازر اسم عم ابراهيم عليه السلام واما ابوه فانه تارح.
অর্থ : “ক্বামূস অভিধানে উল্লেখ করা হয়েছে, আযর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচার নাম। আর নিশ্চয়ই উনার পিতার নাম হলো হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম।”
মূলতঃ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনিসহ সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগ উনাদের পিতা-মাতা বা পূর্বপুরুষ ছিলেন পরিপূর্ণ ঈমানদার, খালিছ মু’মিন। কেউই কাফির ছিলেন না।
এ সম্পর্কে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে-
ان اباء الانبياء ماكانوا كفارا ويدل عليه وجوه منها قوله وتقلبك فى الساجدين.
অর্থ : “নিশ্চয়ই সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের পিতা বা পূর্বপুরুষ উনারা কেউই কাফির ছিলেননা। তার দলীল হচ্ছে, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার এ কালাম বা পবিত্র আয়াত শরীফ-
وتقلبك فى السجدين.
অর্থাৎ : “তিনি আপনাকে (হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) সিজদাকারীগণ উনাদের মধ্যে স্থানান্তরিত করেছেন।” (পবিত্র সূরা শুয়ারা শরীফ ২৯, তাফসীরে কবীর- ১৩/৩৮)
প্রকাশ থাকে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার জলীলুল ক্বদর নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি হলেন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্বপুরুষ।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
ملة ابيكم ابرهيم هو سمكم الـمسلمين.
অর্থাৎ- “তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র দ্বীন উনার উপর কায়িম থাক। তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান।” (পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৭৮)
কাজেই, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যাঁদের মাধ্যমে যমীনে তাশরীফ এনেছেন অর্থাৎ হযরত আদম ছফীউল্লাহ আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে হযরত আব্দুল্লাহ যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম পর্যন্ত উনারা সকলেই ছিলেন সিজদাকারী। অর্থাৎ সকলেই নামায-কালাম, যিকির-আযকার, ইবাদত-বন্দিগীতে মশগুল ছিলেন। উনারা সকলেই পূর্ণ পরহেযগার, মুত্তাক্বী ও ধার্মিক ছিলেন।
এ সম্পর্কে পবিত্র তাফসীর শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত রয়েছে-
فالاية دالة على ان جميع اباء محمد صلى الله عليه وسلم كانوا مسلمين وحينئذ يجب القطع بان والد ابراهيم عليه السلام كان مسلما.
অর্থ : “উপরোক্ত আয়াত শরীফ উনার দ্বারা এটাই ছাবিত বা প্রমাণিত যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্বপুরুষ উনারা সকলেই পরিপূর্ণ মুসলমান ছিলেন। এ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত বা সাব্যস্ত যে, নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পিতা মুসলমান ছিলেন।” (তাফসীরে কবীর শরীফ- ১৩/৩৮)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন-
لـم ازل انقل من اصلاب الطاهرين الى ارحام الطاهرات.
অর্থ : “আমি সর্বদা পূত-পবিত্র নারী ও পুরুষ উনাদের মাধ্যমেই স্থানান্তরিত হয়েছি।” সুবহানাল্লাহ! (তাফসীরে কবীর শরীফ- ১৩/৩৯)
তিনি আরো বলেন-
لـم يلتق ابوى قط على سفاح.
অর্থ : “আমার পিতা-মাতা (পূর্বপুরুষ) কেউই কখনও কোন অন্যায় ও অশ্লীল কাজে জড়িত হননি।” (কানযুল উম্মাল শরীফ, ইবনে আসাকীর, বারাহিনে কাতিয়াহ)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
بعثت من خير قرون بنى ادم قرنا فقرنا حتى بعثت من القرن الذى كنت فيه.
অর্থ : “আমি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার সন্তানগণ উনাদের মধ্যে সর্বোত্তম সম্প্রদায়ের মধ্যেই সর্বদা প্রেরিত হয়েছি। এমনকি আমি যে (কুরাইশ) সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিলাম সেটিই ছিলো সর্বোত্তম সম্প্রদায়।” সুবহানাল্লাহ! (বুখারী শরীফ, তাফসীরে মাযহারী শরীফ ৪র্থ খ- ৩০৮ পৃষ্ঠা)
এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় কিতাবে বর্ণিত হয়েছে-
فلا يـمكن ان يكون كافرا فى سلسلة ابائه صلى الله عليه وسلم.
অর্থ : “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পিতা (পূর্ব পুরুষ) উনাদের সিলসিলার মধ্যে কেউই কাফির হওয়া সম্ভব নয়।” (তাফসীরে মাযহারী শরীফ ৪র্থ খ- ৩০৮ পৃষ্ঠা)
এ সম্পর্কে কিতাবে আরো বর্ণিত রয়েছে-
ان احدا من اجداده ما كان من الـمشركين.
অর্থ : “নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বাপ-দাদাগণ উনারা কেউই মুশরিক ছিলেননা।” (তাফসীরে কবীর শরীফ- ১৩ খ- ৩৯ পৃষ্ঠা)
উল্লেখ্য, অনেকে “পবিত্র সূরা মারইয়াম শরীফ” উনার ৪৭নং পবিত্র আয়াত শরীফ ও পবিত্র সূরা তওবা শরীফ উনার ১১৪নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনাদের বরাত দিয়ে বলে থাকে যে, “হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি উনার পিতার জন্য ইস্তিগফার করেছেন। কাজেই উনার পিতা ঈমানদার ছিলেননা।” নাউযুবিল্লাহ!
মূলতঃ যারা একথা বলে থাকে, তারা উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফদ্বয় উনাদের অর্থই বুঝেনি। কারণ “পবিত্র সূরা মারইয়াম শরীফ” উনার ৪৭নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
قال سلم عليك ساستغفر لك ربى.
অর্থ : “হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, আপনার প্রতি (বিদায়কালীন) সালাম, অচিরেই আমি আমার প্রতিপালক উনার নিকট আপনার জন্য মাগফিরাত কামনা করবো।”
অনুরূপ “পবিত্র সূরা তওবা শরীফ” উনার ১১৪নং পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
ما كان استغفار ابرهيم لابيه الا عن موعدة وعدها اياه.
অর্থ : “হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার তরফ থেকে স্বীয় চাচার মাগফিরাত কামনা করা ছিলো কেবলমাত্র তার সাথে ওয়াদা করার কারণে।” অর্থাৎ প্রথমত হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি স্বীয় চাচার সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, তিনি তার জন্য ইস্তিগফার করবেন যেন উনার চাচা তওবা করে, শিরক ছেড়ে ঈমান গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায় সেজন্য দোয়া করবেন।
আর তাই “পবিত্র সূরা তওবা শরীফ” উনার ১১৪নং আয়াত শরীফ উনার মধ্যে সেই ওয়াদা পালনার্থে এবং মুশরিকদের জন্য দোয়া করা নিষেধ হওয়ার পূর্বে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি উনার চাচার জন্য দোয়া করেছিলেন।
যেমন, উক্ত আয়াত শরীফ উনার তাফসীর শরীফ-এ এসেছে-
ان ذلك كان قبل النهى عن الاستغفار للمشرك وقد قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لعمه ابى طالب والله لاستغفرن لك.
অর্থ : “নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার ইস্তিগফার কামনা করাটা ছিল মুশরিকদের জন্য দোয়া করা নিষেধ হওয়ার পূর্বের। যেমন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (নিষেধ হওয়ার পূর্বে) উনার চাচা আবূ তালিব উনাকে বলেছিলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! অবশ্যই আমি আপনার তওবা নছীব হওয়ার জন্য দোয়া করবো।” (তাফসীরে মাযহারী শরীফ ৬/১০০)
এছাড়া হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা আযরের জন্য এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চাচা আবূ তালিবের জন্য সরাসরি দোয়া করেননি; বরং তাদের ইস্তিগফার কামনা করেছেন। অর্থাৎ আযর ও আবু তালিব তাদের যেন তওবা নছীব হয়, তারা যেন ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়, ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয় সেজন্য দোয়া করেছেন। আর তাও ছিল মুশরিকদের জন্য দোয়া নিষেধ সংক্রান্ত বিধান (আয়াত শরীফ) নাযিল হওয়ার পূর্বে।
আর চাচা হিসেবে আযর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার এবং আবূ তালিব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনেক খিদমত করেছে। তার বিনিময় স্বরূপ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা তাদের ইস্তিগফার (তওবা কবুল হওয়ার দোয়া) কামনা করেছেন।
এ সম্পর্কে তাফসীরে উল্লেখ রয়েছে-
وما كان استغفار ابراهيم لابيه يعنى ازر وكان عما لابراهيم عليه السلام وكان ابراهيم بن تارح عليه السلام.
অর্থ : “হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার পিতার জন্যে ইস্তিগফার করেন অর্থাৎ আযরের জন্যে ইস্তিগফার করেন। আযর ছিল হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার চাচা। আর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি ছিলেন হযরত তারাহ আলাইহিস সালাম উনার ছেলে।” (তাফসীর মাযহারী শরীফ ৪ খ- ৩০৮ পৃষ্ঠা)
এ কথা বিশেষভাবে স্মরণীয় ও প্রণিধানযোগ্য যে, সকল হযরত ইমাম-মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনারা এ বিষয়ে ইজমা বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র শরীর মুবারকে বা পা মুবারকে যা কিছু স্পর্শ করেছে তা আরশে মুআল্লা উনার চাইতে লক্ষ-কোটি গুণ বেশি মর্যাদাবান। সুবহানাল্লাহ!
তাহলে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র অজুদ ‘নূর’ মুবারক তা যাঁদের মাধ্যম হয়ে পর্যায়ক্রমে স্থানান্তরিত হয়ে তিনি যমীনে আগমন করেছেন সেই সকল ব্যক্তিগণ উনাদের মর্যাদা কত বেমেছাল হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
বস্তুত সাইয়্যিদুনা হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার মহান শানে এরূপ কুফরীমূলক উক্তি করার অর্থ হলো খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক শানে চরম ধৃষ্ঠতা প্রদর্শন করা। যা কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।
আরো উল্লেখ্য, যেই পবিত্র নসব-নসল সূত্রে হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ আনেন উনাদের পূর্ব-পুরুষ উনাদের নসব-নসলনামায় ‘কেউ কেউ ঈমানদার ছিলেননা’ এরূপ কল্পনা বা ধারণা করাও কাট্টা কুফরী।
উপরোক্ত দলীলভিত্তিক সংক্ষিপ্ত আলোচনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পিতা ছিলেন হাক্বীক্বী পরহেযগার, মুত্তাক্বী, পরিপূর্ণ ঈমানদার ও মুসলমান। উনার নাম মুবারক ছিল হযরত তারাখ মতান্তরে তারিহ বা তারাহ আলাইহিস সালাম। আর আযর নামক ব্যক্তি ছিল উনার চাচা। আরো প্রমাণিত হলো যে, পূর্ববর্তী সকল হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের পূর্বপুরুষগণ এবং সর্বোপরি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্বপুরুষগণ হযরত আদম ছফীউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার থেকে শুরু করে হযরত আব্দুল্লাহ যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পর্যন্ত সকলেই ছিলেন পূত-পবিত্র চরিত্র মুবারক উনার অধিকারী, পূর্ণ ধার্মিক ও পরিপূর্ণ মুসলমান।
অতএব, যে ব্যক্তি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত পিতা ও পরিবার সম্পর্কে কুফরীমূলক আক্বীদা রাখবে ও বক্তব্য-লিখনী প্রকাশ করবে পবিত্র ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী তার উপরে মুরতাদের হুকুম বর্তাবে। অর্থাৎ সে ইসলাম বা মুসলমান থেকে খারিজ হয়ে যাবে। পবিত্র ইসলামী খিলাফত থাকলে তাকে তিনদিন সময় দেয়া হতো তওবা করার জন্য। তিনদিনের মধ্যে তওবা না করলে তার শাস্তি হতো মৃত্যুদ-। সে মারা গেলে তার জানাযা পড়া জায়িয হবে না। তাকে মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করা যাবে না; বরং তাকে মৃত কুকুর-শৃগালের মত মাটিতে পুঁতে রাখতে হবে। তার জীবনের সমস্ত নেক আমল বাতিল হয়ে যাবে। বিয়ে করে থাকলে তার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে এবং সে হজ্জ করে থাকলে তা বাতিল হয়ে যাবে। সে ওয়ারিছসত্ব থেকেও বঞ্চিত হবে।
{দলীলসমূহ : (১) তাফসীরে মাযহারী, (২) ইবনে কাছীর, (৩) ইবনে আবী হাতিম, (৪) কবীর, (৫) আহকামুল কুরআন, (৬) আহমদী, (৭) তাফসীরে বাইযাবী, (৮) বয়ানুল হক্ব, (৯) মাআলিমুত তানযীল, (১০) তাফসীরে জালালাইন, (১১) বুখারী, (১২) মুসলিম, (১৩) তিরমিযী, (১৪) বাইহাক্বী, (১৫) মিশকাত, (১৬) মুস্তাদরাকে হাকিম, (১৭) তবারানী, (১৮) কামূস, (১৯) ফতহুল বারী,(২০) উমদাতুল ক্বারী, (২১) মিরকাত, (২২) আশয়াতুল লুময়াত, (২৩) লুময়াত, (২৪) তা’লীকুছ ছবীহ, (২৫) শরহুত ত্বীবী, (২৬) মুযাহিরে হক্ব, (২৭) ফতহুল মুলহিম, (২৮) শরহে নববী, (২৯) আহমদ, (৩০) ইবনে আসাকির, (৩১) ইবনে মারদুবিয়া, (৩২) তাক্বদীসু আবায়িন নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, (৩৩) দুররুল মুখতার, (৩৪) ফিকহুল আকবর, (৩৫) শরহুশ শিফা, (৩৬) শুমুলুল ইসলাম লি উছূলির রসূলিল কিরাম, (৩৭) আকাইদে নিজামিয়া, (৩৮) কাছাছূল আম্বিয়া, (৩৯) কাছাছূল কুরআন, (৪০) কুরআন কাহিনী, (৪১) কিতাবুদ্ দারাযিল, (৪২) মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া, (৪৩) শাওয়াহিদুন্ নুবুওওয়াহ, (৪৪) কিছাছে আম্বিয়া, (৪৫) মাতালিউন নূর, (৪৬) আল মুসতালিদ, (৪৭) বারাহিনে ক্বাতিয়া ইত্যাদি।}

মুহম্মদ মুসলেহুদ্দীন
সানার পাড়, ঢাকা

সুওয়াল: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কায়িনাত মাঝে হাযির-নাযির হওয়ার বিষয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের কি আক্বীদা?
জাওয়াব: মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র সূরা ফাতহ শরীফ উনার ৯ নম্বর পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
انا ارسلناك شاهدا
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে (হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি।’
জানা আবশ্যক, যিনি সাক্ষ্য দিবেন উনার জন্য যেরূপ হাযির বা উপস্থিত থাকা শর্ত, তদ্রƒপ নাযির বা দেখাও শর্ত।
কাজেই, বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট কুল-মাখলুক্বাতের সবকিছুই হাযির ও নাযির।
এটিই হচ্ছে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা। এর বিপরীত আক্বীদা পোষণকারীরা ৭২টি বাতিল ও জাহান্নামী ফিরক্বার অন্তর্ভুক্ত।
যামানার ইমাম ও মুজতাহিদ, যামানার মুজাদ্দিদ, মুজাদ্দিদে আ’যম, ইমামুল আইম্মাহ, মুহইস সুন্নাহ, কুতুবুল আলম, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা ইমাম রাজারবাগ শরীফ উনার মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি ‘বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ’ উনাদের বরাত দিয়ে বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
انما انا قاسم والله يعطى
অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক তিনি হাদিয়া করেন আর নিশ্চয়ই আমি হলাম (উক্ত হাদিয়া) বণ্টনকারী।” অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার সর্বপ্রকার নিয়ামত নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে হাদিয়া করেছেন। আর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কুল-মাখলূক্বাতের যাকে যতটুকু ইচ্ছা তাকে ততটুকু নিয়ামত বণ্টন করেন। সুবহানাল্লাহ!
উল্লেখ্য, যিনি কুল-মাখলুক্বাতের জন্য নিয়ামত বণ্টনকারী; তিনি যদি কুল-মাখলূক্বাতের কাছে হাযির বা উপস্থিত না থাকেন এবং তাদেরকে নাযির বা দেখে না থাকেন, তাহলে তিনি তাদের মাঝে কিভাবে নিয়ামত বণ্টন করবেন? কাজেই কায়িনাতের সমস্ত সৃষ্টির জন্য তিনি যেহেতু নিয়ামত বণ্টনকারী, সেহেতু বলার অপেক্ষা রাখে না- সবকিছুই উনার নিকট হাযির ও নাযির।
হযরত ইমাম তবারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত নঈম ইবনে উমর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের থেকে পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত রয়েছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
ان الله قد رفع لى الدنيا فانا انظر اليها والى ما هو كائن فيها الى يوم القيامة كانما انظر الى كفى هذه
অর্থ: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি এই পৃথিবীকে আমার চোখের সামনে এরূপভাবে রেখেছেন যে, আমি এ সমগ্র পৃথিবীকে এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার মধ্যে যা কিছু সৃজিত বা সংঘটিত হবে তদসমূহকে ওইরূপভাবে দেখি, যেরূপ আমার হাত মুবারক উনার তালু মুবারক দেখে থাকি।” সুবহানাল্লাহ! (তবারানী শরীফ, মিশকাত শরীফ)
স্মরণীয় যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি জিসিম ও ছূরত-এ দুটির কোনো একটি হিসেবে হাযির ও নাযির নন। বরং তিনি ছিফত অর্থাৎ ইলম ও কুদরত মুবারক উনার দ্বারা এবং ছিফত মিছালী ছূরত মুবারক হিসেবে কায়িনাতের সমস্ত স্থানে হাযির ও নাযির। আর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ছিফত অর্থাৎ ইলম ও মু’জিযা শরীফ দ্বারা এবং ছিফত অর্থাৎ নূর ও রহমত হিসেবে কায়িনাতের সমস্ত স্থানে হাযির ও নাযির। আর উনার যেহেতু জিসিম ও ছূরত মুবারক রয়েছে, সেহেতু তিনি যে জিসিম মুবারকে পবিত্র রওযা শরীফ উনার মধ্যে অবস্থান করছেন উনার ইখতিয়ার ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই জিসিম মুবারক নিয়ে কোথাও হাযির হবেন না। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের হযরত ইমাম-মুজতাহিদগণ উনারা এ বিষয়ে একমত যে, তিনি ওই জিসিম মুবারক নিয়ে রওযা শরীফ থেকে উঠলে ক্বিয়ামত হয়ে যাবে। তাই তিনি উক্ত জিসিম মুবারক উনার অনুরূপ জিসিম মুবারক ও ছূরত মুবারক এবং মিছালী ছূরত মুবারক-এ কায়িনাত মাঝে হাযির ও নাযির থাকেন, যে কারণে উনার আশিকগণ উনাকে স্বপ্নে, মুরাক্বাবা-মুশাহাদার হালতে, এমনকি জাগ্রত অবস্থার মধ্যেও দেখে থাকেন এবং কথোপকথনও করে থাকেন। সুবহানাল্লাহ!
কাজেই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট কুল-মাখলূক্বাতের সবকিছুই হাযির ও নাযির। এটিই হচ্ছে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনাদের আক্বীদা। এর বিপরীত আক্বীদা পোষণকারীরা ৭২টি বাতিল ও জাহান্নামী ফিরক্বার অন্তর্ভুক্ত।