সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ তথা ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে খুশি মুবারক প্রকাশ করলে নিশ্চিত জান্নাতী হবে

সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ তথা ঈদে আযম,ঈদে আকবর, পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন এক মহান আমল, এমন এক ঈদ, যদি কোন মানুষ এই ঈদ পালন করে তাহলে অবশ্যই সে প্রতিদান পাবেই পাবে !!

মানুষের সমগ্র জীবনের অনেক আমল থাকে, সে আমল আল্লাহ পাক উনার দরবারে কবুল হতেও আবার নাও হতে পারে ! কিন্তু কেউ যদি পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করে, খুশি প্রকাশ করে এটা নিশ্চিত তার এই আমল কবুল হবেই হবে !! এ আমল কখনোই বৃথা যাবে না !
আজকে আলোচনায় আমরা এ প্রসঙ্গে সুক্ষ কিছু আলোচনা করবো ! সবাই একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ুন !!!!

আমরা সবাই আবু লাহাবের কথা জানি। আবু লাহাব হচ্ছে কাট্টা কাফির ! হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নবুওয়াত মুবারক প্রকাশ করার পর থেকে সে লাগাতার বিরোধিতায় লিপ্ত ছিলো ! শুধু তাই নয় এই কাফির আবু লাহাব স্ব পরিবারে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চরম বিরোধিতা করতো !!
আল্লাহ পাক এই আবু লাহাব এবং তার স্ত্রীর ধ্বংস ঘোষনা করে সূরা লাহাব নামে একটি সূরা নাজিল করে দিলেন ! এছাড়া সূরা বাকারা শরীফ উনার প্রথম দিককার কিছু আয়াত শরীফও আবু লাহাবের ব্যাপারে নাজিল হয় !

তো হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বিলাদত শরীফ লাভ করেন তখন এই আবু লাহাব নিজের ভাই হযরত সাইয়্যিদুনা আবদুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার মুবারক পুত্র উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে । এ খুশি প্রকাশ কিন্তু সে নবী হিসাবে করে নাই, এ খুশি করেছিলো সে নিজের ভাইয়ের পুত্র উনার আগমন উপলক্ষে !!
আর এই খুশি প্রকাশ করাটাই তার জন্য একটি বিশেষ সুসংবাদের বিষয় হিসাবে প্রমানিত হয়েছে !!

আসুন এবার আমরা সহীহ হাদীস শরীফ থেকে দেখি কি ঘটনা ঘটেছিলো —

قَالَ حَضَرَتْ عُرْوَةُ رَضِىَ الله تَعَالى عَنْهُ وَ حضرت ثُوَيْبَةُ عَلَيْهَا السَلاَمُ مَوْلاَة لاَبِى لَهَب كَانَ اَبُو لَهَب اَعْتَقَهَا فَاَرْضَعَتِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا مَاتَ اَبُو لَهَب اُرِيَهُ بَعْضُ اَهْلِه بِشَرّ حِيبَةٍ قَالَ لَه مَاذَا لَقِيتَ قَالَ اَبُو لَهَبٍ لَمْ اَلْقَ بَعْدَكُمْ غَيْرَ اَنّى سُقِيتُ فِى هَذِه بِعَتَاقَتِى حَضَرَتْ ثُوَيْبَةَ عَلَيْهَا السَلاَمُ

অর্থ : হযরত উরওয়া রদ্বিয়াল্লাহু আনহু তিনি বর্ননা করেন, হযরত সুয়াইবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তিনি ছিলেন আবু লাহাবের বাঁদী এবং আবু লাহাব হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি হয়ে উনার খিদমত মুবারক করার জন্য হযরত সুয়াইবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা কে আযাদ করে দিয়েছিলো ! এরপর আখেরী রসূল, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে তিনি দুধ পান করান। অতঃপর আবু লাহাব যখন মারা গেলো (কিছুদিন পর) তার পরিবারের একজন অর্থাৎ তার ভাই হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে, আবু লাহাব সে ভিষন কষ্টের মধ্যে নিপতিত আছে! তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হয়েছে ? আবু লাহাব উত্তরে বললো, যখন থেকে আপনাদের থেকে দূরে রয়েছি তখন থেকেই ভীষন কষ্টে আছি ! তবে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে বাঁদী সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনাকে দু’আঙ্গুলের ইশারায় আযাদ/মুক্তি দেয়ার কারনে সেই দু’আঙ্গুল হতে সুমিষ্ট ঠান্ডা ও সুশীতল পানি পান করতে পারছি !”
(সহীহ বুখারী শরীফ –কিতাবুননিকাহ- ২য় খন্ড ৭৬৪পৃষ্ঠা, উমদাতুল ক্বারী লি শরহে বুখারী ২০ খন্ড ৯৩ পৃষ্ঠা)

বিখ্যাত মুহাদ্দিস, বুখারী শরীফের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার, হাফিজে হাদীস, হযরত ইবনে হাজার আসকালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং বিখ্যাত মুহাদ্দিস, হাফিজে হাদীস, হযরত বদরুদ্দীন আইনী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনারা উনাদের বুখারী শরীফের শরাহ ‘‘ফতহুল বারী শরহে বুখারী এর ৯ম খন্ড ১১৮ পৃষ্ঠা এবং উমদাতুল ক্বারী শরহে বুখারী এর ২০ তম খন্ডের ৯৫ পৃষ্ঠায়’’ উল্লেখ করেছেন-

وذكر السهيلى ان العباس قال لما مات ابو لهب رايته فى منامى بعد حول فى شر حال فقال ما لقيت بعد كم راحة الا ان العذاب يخفف عنى فى كل يوم اثنين وذلك ان النبى صلى الله عليه وسلم ولد يوم الاثنين وكانت ثويبة بشرت ابا لهب بمولده فاعتقها.

অর্থ: হযরত ইমাম সুহাইলী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি উল্লেখ করেন যে, হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু তিনি বলেন, আবু লাহাবের মৃত্যুর এক বছর পর তাকে স্বপ্নে দেখি যে, সে অত্যন্ত দুরবস্থায় রয়েছে ! সে বললো, (হে ভাই হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু) আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার পর আমি কোন শান্তির মুখ দেখি নাই।
তবে হ্যাঁ, প্রতি সোমবার শরীফ যখন আগমন করে তখন আমার থেকে সমস্ত আযাব লাঘব করা হয়, আমি শান্তিতে থাকি। হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু তিনি বলেন,আবু লাহাবের এ আযাব লাঘব হয়ে শান্তিতে থাকার কারন হচ্ছে, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ এর দিন ছিলো সোমবার শরীফ ! সেই সোমবার শরীফ এ হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফের সুসংবাদ নিয়ে আবু লাহাবের বাঁদী সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা তিনি আবু লাহাবকে জানালেন তখন আবু লাহাব বিলাদত শরীফের খুশির সংবাদ শুনে খুশি হয়ে হযরত সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনাকে তাৎক্ষনাৎ আযাদ করে দেয় !”
(ফতহুল বারী শরহে বুখারী ৯ম খন্ড ১১৮ পৃষ্ঠা, উমদাতুল ক্বারী লি শরহে বুখারী ২০ খন্ড ৯৫ পৃষ্ঠা, মাওয়াহেবুল লাদুননিয়াহ ১ম খন্ড , শরহুয যারকানী ১ম খন্ড ২৬০ পৃষ্ঠা)

বিখ্যাত মুহাদ্দিস, হাফিজে হাদীস আল্লামা হযরত ইবনু কাছীর রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবে লিখেন–

قال للعباس انه ليخفف على فى مثل يوم الاثنين قالوا لانه لما بشرته ثويبة بميلاد ابن اخيه محمد بن عبد الله اعتقها من ساعته فجوزى بذلك لذلك

অর্থ : আবু লাহাব হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনাকে বললো, ( হে ভাই) অবশ্যই এ কঠিন আযাব সোমবার শরীফ এর দিন লাঘব করা হয়, আল্লামা হযরত সুহাইলী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও অন্যান্যরা বলেন, হযরত সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা তিনি আবু লাহাবকে তার ভাতিজা হযরত আব্দুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার নূরী আওলাদ,হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ এর সুসংবাদ দেন তৎক্ষনাৎ সে খুশিতে উনাকে মুক্ত করে দেয় ! এই কারনেই আযাব লাঘব হয়ে থাকে !” ( আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১ম খন্ড ৩৩২ পৃষ্ঠা ,মাছাবাতা বিস সুন্নাহ ১ম খন্ড ৮৩ পৃষ্ঠা)

এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ঐতিহাসিক আল্লামা ইয়াকুব রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবে লিখেন-

قال النبى صلى الله عليه وسلم رأيت ابا لهب فى النار يصيح العطش العطش فيسقى من الماء فى نقر ابهامه فقلت بم هذا فقال بعتقى ثويبة لانها ارضعتك.

অর্থ : ‘‘হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, আমি আবু লাহাবকে দেখেছি জাহান্নামের আগুনে নিমজ্জিত অবস্থায় চিৎকার করে বলছে, পানি দাও ! পানি দাও !
অতঃপর তার বৃদ্ধাঙুলীর গিরা দিয়ে পানি পান করানো হচ্ছে। আমি বললাম, কি কারনে এ পানি পাচ্ছো ? আবু লাহাব বললো, আপনার বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে হযরত সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনাকে মুক্ত করার কারনে এই ফায়দা পাচ্ছি ! কেননা তিনি আপনাকে দুধ মুবারক পান করিয়েছেন !”
(তারীখে ইয়াকুবী ১ম খন্ড ৩৬২ পৃষ্ঠা )

উপরোক্ত হাদীস শরীফ সমূহের ব্যাখ্যায় হাফিজে হাদীস হযরত আল্লামা কুস্তালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি , হাফিজে হাদীস আল্লামা যুরকানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি , ইমামুল মুহাদ্দিসিন শায়েখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সহ শত শত ইমাম মুহাদ্দিস গন বলেন –

قال ابن الجزرى فاذا كان هذا الكافر الذى نزل القران بذمه جوزى فى النار بفرحه ليلة مولد النبى صلى الله عليه وسلم به فما حال المسلم الموحد من امته عليه السلام يسر بمولده ويبذل ما تصل اليه قدرته فى محبته صلى الله عليه وسلم لعمرى انما يكون جزاؤه من الله الكريم ان يدخل بفضله العميم جنات النعيم.

অর্থ : ‘‘হযরত ইবনুল জাযরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আবু লাহাবের মত কাট্টা কাফির যার নিন্দায় কুরআন শরীফে আয়াত শরীফ ও সূরা শরীফ পর্যন্ত নাজিল হয়েছে, তাকে যদি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ এর রাত্রিতে আনন্দিত হয়ে খুশি প্রকাশ করার কারনে জাহান্নামেও তার পুরস্কার দেয়া হয়ে থাকে তবে হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উম্মতের কোন মুসলমান যদি ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষে খুশি মুবারক প্রকাশ করে, তার সাধ্যনুযায়ী টাকা-পয়সা ইত্যাদি খরচ করে তাহলে তাদের অবস্থা কিরুপ হবে ? নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক উনার দয়া এবং অনুগ্রহে অবশ্যই অবশ্যই তাকে নিয়ামতপূর্ন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন !”
(মাওয়াহেবুল লাদুননিয়া ১ম খন্ড ২৭ পৃষ্ঠা, শরহুয যারকানী ১ম খন্ড ২৬১ পৃষ্ঠা, মাছাবাতা বিস সুন্নাহ ১ম খন্ড ৮৩ পৃষ্ঠা)

আর এ প্রসঙ্গে ইমামুল মুহাদ্দিসিন, শায়েখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-  ‘‘যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ দিবসকে সম্মান করবে এবং খুশি প্রকাশ করবে সে চির শান্তিময় জান্নাতের অধিকারী হবে।” (মাছাবাতা বিস সুন্নাহ ১ম খন্ড, খুতবায়ে ইবনে নুবাতা)

মহান আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে উপরোক্ত আলোচনা থেকে থেকে শিক্ষা গ্রহন করার তৌফিক দান করুন । এবং পবিত্র বিলাদত শরীফ উপলক্ষে সর্বোচ্চ খুশি মুবারক প্রকাশ করার সৌভাগ্য দান করুন । আমীন ।