ত্রয়োদশ হিজরী শতকে পবিত্র ঈদে মীলাদে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন

নির্ভরযোগ্য আলিম মাওলানা হাফিজ মুহাম্মদ আব্দুল হক্ব এলাহাবাদী মুহাজিরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার স্বরচিত বিখ্যাত কিতাবে শায়েখ আব্দুল আযীয দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মন্তব্য তুলে ধরেছেন এভাবে- “শায়েখ আব্দুল আযীয দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মুহররমুল হারাম মাসের অনুষ্ঠান মরসিয়াখানি (শোক গাঁথা পাঠ) সম্পর্কে জনৈক ব্যক্তির জিজ্ঞাসার উত্তরে বললেন, সারা বছরের মধ্যে এ ফকীরের (আমার) বাড়িতে দুটি মজলিস অনুষ্ঠিত হয়।

একটি হচ্ছে মিলাদ শরীফ উনার আলোচনা অনুষ্ঠান, আর অপরটি হচ্ছে শাহাদাতে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম উনার আলোচনা।
প্রথম মজলিসে পবিত্র আশূরা শরীফ উনার দিন চারশত বা পঁাঁচশত এবং প্রায় এক হাজার লোকের সমাগম হয়। সে মজলিসে দুরূদ শরীফ পাঠ করা হয়। আমিও সে মজলিসে উপস্থিত হয়ে বসি। আর সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম উনার সম্পর্কে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে যেসব ফযীলত বর্ণিত হয়েছে মজলিসে তাও বর্ণনা করা হয়।
আর সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম উনার এবং উনার সাথীদের শাহাদাত লাভের ফযীলত সম্পর্কেও কিছু কিছু হাদীছ শরীফ বর্ণনা করা হয়। আর উনাদের শহীদকারীদের খারাপ পরিণতি সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়। এ উপলক্ষে জীন-পরী থেকে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আস সাদিসা আলাইহাস সালাম ও অন্যান্য হযরত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা যে শোক গাঁথা শুনেছেন তারও কিছু কিছু আবৃত্তি করা হয়। হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সহ অন্যান্য হযরত ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা যে বিস্ময়কর অদ্ভুত স্বপ্ন মুবারক দেখেছেন তাও আলোচনা করা হয়।

আর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যে, এ হৃদয় বিদারক ঘটনায় মর্মাহত হয়েছেন তাও আলোচনা করা হয়। এরপর পবিত্র কুর’আন মাজিদ খতম করা হয় এবং পাঁচটি আয়াত শরীফ পাঠ করে উপস্থিত লোকদের রূহের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করা হয়। এর মাঝে কোনো ব্যক্তি সুললিত কন্ঠে সালাম পাঠ করলে অথবা (মরসিয়াহ) শোক গাঁথা পাঠ করলে উপস্থিত লোকদের ও ফকীরদের মনটি কোমল হয়ে মুহব্বতের আলোকে আবেগে নয়ন যুগল অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে এবং কান্নায় অস্থির হয়ে যায়। এ ধরণের আরও অনেক পূণ্যময় কাজ করা হয়।

অতএব এ কাজগুলো যদি বানোয়াট ও শরীয়ত বিরোধী কাজ হতো তাহলে এ ফকীরের নিকট তা বৈধ হতো না এবং আদৌ তা সমর্থন করতাম না।
এখন আসুন মীলাদ শরীফ অনুষ্ঠানের আলোচনায়। পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার মহাসম্মানিত ১২ই শরীফ তারিখ লোকজন পূর্বাভাস মাফিক আমার বাড়িতে এসে জমা হয় এবং দুরূদ শরীফ পাঠে তারা মশগুল হয়। আর এ ফকীরও দুরূদ শরীফ পাঠে তাদের সাথে শামিল হয়। প্রথমত নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ফযীলত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছ শরীফ সমূহের কিছু কিছু বর্ণনা করা হয়। এরপর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের ঘটনাবলী। উনার জিসিম মুবারক উনার অবয়বের গঠন আকৃতি, দুগ্ধপানকালীন কিছু অবস্থা ও ঘটনাবলীসহ কিছু কিছু হাদীছ শরীফও বর্ণনা করা হয়।
এরপর উপস্থিত লোকদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী এবং ফাতিহার নিয়তে শিরনী ও মিষ্টান্ন বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া পুরানো রীতি অনুযায়ী সবশেষে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূরুল ফাতাহ বা চুল মুবারক সকলকে দেখানো হয়।” (আদ-দুররুল মুনাজ্জাম ফি হুকুমে আমলে মাওলাদিন নাবীয়্যিল আ’যম, পৃষ্ঠা ২০৯-২১১)

হযরত শাহ মুহম্মদ ইসহাক্ব মুহাদ্দিছ দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার স্থলাভিষিক্ত উস্তাযুল উলামা হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল গনী মুহাদ্দিছ দেহলবী মুহাজিরে মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার মাহফিলে শরীক হতেন। যেমন- উনার বিশিষ্ট শাগরিদ হযরত শাহ আব্দুল হক্ব মুহাজিরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি লিখেন,
شیخنا ومرشدنا حضرت عمدۃ المفسرین وزبدۃ المحدثین جناب مولانا شاہعبد الغنی صاحب نقشبندی مجددی قدس سرہ را دیدہ است کہ در محفلمولود النبی صلی اللہ علیہ وسلم کہ فارسی در مدینہ منورہ علی صاحیھاالصلوۃ والسلام بتاریخ دوازدہم ماہ ربیع الاول روز یکشنبہ ۱۲۸۷ھجری در مسجد نبوی شدہ بود تشریف اور دہ شریک ایں محفل شریفشذد وذکر مولود شریف کے در صحن مسجد شریف بر ممبر کدامی ازائمہ یکے بعد از دیگرے متوجہ بطرف روضہ شریف شدہ می خواند نداستماع فرموند وقت قیام ذکر ولادت شریف فرمودند وحال وکیفیات ایںمحفل شریف کہ ظھور شدہ بود خارج از حیطئہ تقریر است ونزدحضرت ایں شاں ترجیح بد لائل صحیح ہماں امور را بود کہ ہر اںبودند.
অর্থ : “আমাদের শায়েখ ও মুর্শিদ উমদাতুল মুফাস্সিরীন, যুবদাতুল মুহাদ্দিছীন জনাব মাওলানা শাহ আব্দুল গনী ছাহেব নকশবন্দী মুজাদ্দিদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে আমি দেখেছি পবিত্র মদীনা শরীফ-এ ১২৮৭ হিজরী সনে পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার ১২ তারিখে ইয়াওমুল আহাদ বা রোববার দিনে পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ উনার মধ্যে পবিত্র মীলাদ শরীফ উনার অনুষ্ঠানে শরীক হন এবং পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ উনার আঙিনা মুবারক-এ মিম্বরে বসে একের পর এক ইমামগণ পবিত্র রওযা শরীফ উনার দিকে মুখ করে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আগমন মুবারক উনার যে আলোচনা করছিলেন, তা শুনেন। পবিত্র ক্বিয়াম শরীফ উনার সময় সবার সাথে পবিত্র ক্বিয়াম শরীফও করেন। এ পবিত্র মাহফিলে হাল ও বরকত যা প্রকাশ পেয়েছিল, তা বলার ভাষা নেই।” (আদ-দুররুল মুনাজ্জাম, রিসালায়ে আসরারে মুহব্বত)